সপ্তম খৃস্টাব্দের বামন, দশম খৃস্টাব্দের অভিনবগুপ্ত, একাদশ খৃস্টাব্দের ভোজদেব, দ্বাদশ খৃস্টাব্দের সারদাতনয়, সর্বানন্দ, রামচন্দ্র, গুণচন্দ্র এবং ত্রয়োদশ খৃস্টাব্দের সাগরনন্দীসহ আরও অনেক স্বনামখ্যত সাহিত্যিকদের রচনায় ভাস এর নাম পাওয়া যায়। এছাড়াও অসংখ্য প্রাচীন শ্লোকে বিভিন্ন যুগের প্রাজ্ঞ লেখকগণ সশ্রদ্ধায় ভাসের নাম স্মরণ করেছেন। দণ্ডী, বামন, ভামহ, কালিদাস প্রমুখ কবিগণ নিজেদের রচনায় ভাসের রচনাবলী থেকে অনেক উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আধুনিক যুগের কিছুকাল পর্যন্ত প্রাচীন কবি ও নাট্যকার ভাসের মূল রচনা খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৯০৯ সালে মহামহোপাধ্যায় ডাঃ টি গণপতি শাস্ত্রী কয়েকটি পুরাতন পুঁথি ধূলিধূসরিত-অবহেলিত অবস্থায় এক কৃষকের ভাঁড়ার ঘর থেকে খুঁজে পান। দেখা যায় এখানে মোট পুঁথির সংখ্যা তের। এখানে এমন সব উপমা, রূপক, অলংকার খুঁজে পাওয়া যায় যা পূর্বে প্রাপ্ত বিভিন্ন লেখকের রচনায় ভাসের রচনা বলে উদ্ধৃত হয়েছে। তবে কোন রচনার সুচনাতেই রচয়িতার নাম না থাকায় কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় অনেকে মনে করেছিলেন যে প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিগুলো বোধহয় ভাসের রচনা নয়। কিন্তু এখন আর কেউ একথা বলেন না। সকলেই মহামহোপাধ্যায় গণপতি শাস্ত্রী মহাশয়ের দেয়া যুক্তি মেনে নিয়েছেন।
ক) রামায়ণের কাহিনী অনুসরণে রচিত নাটক- প্রতিমা ও অভিষেক।
খ) মহাভারতের কাহিনী অনুসরণে রচিত নাটক- পঞ্চরাত্র, দূতঘটোৎকচ, মধ্যমব্যায়োগ, কর্ণভার, উরুভঙ্গ, দূতবাক্য ও বালচরিত(হরিবংশ)।
গ) ঐতিহাসিক নাটক- স্বপ্নবাসবদত্ত, প্রতিজ্ঞাযৌগন্ধরায়ণ।
ঘ) কল্পিত কাহিনী অবলম্বনে রচিত নাটক- চারুদত্ত ও অবিমারক।
অন্তমিলের আদর্শে লিখিত এই রচনাগুলোর কোন শিরোনাম বা বর্ণনা ছিলনা। তবে সবগুলো ছিল আকর্ষণীয় ভাষাবহুল পদ্যে লেখা এবং এক একটি কাহিনী বা নাটক। একাধিক চরিত্রের সংলাপের মধ্য দিয়ে কাহিনী এগিয়ে গেছে। কবিতা রচনায় অসাধারণত্বের জন্য ভাসকে সেকালে মহাকবিও বলা হত। রচনাগুলির নাট্যমান অধিকতর শক্তিশালী বলেই তাঁকে আধুনিককালে নাট্যকার বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত সুকুমারী ভট্টাচার্য বলেছেন- “ভাস ছিলেন প্রথম ভারতীয় নাট্যকার। সংস্কৃত ভাষায় অপর কোনো নাট্যকারের ভাণ্ডারেই এতসংখ্যক নাট্যসম্পদ নেই।” বিমানচন্দ্র ভট্টাচার্য বলেছেন- “রচনাশৈলী, ঘটনাবিন্যাসের পারিপাট্য, ভাষার গাম্ভীর্য ও প্রকাশনপটুতা, শব্দচয়ন, ভাবসমৃদ্ধি প্রভৃতি গুণে নবাবিষ্কৃত নাটকগুলি সংস্কৃত সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। যিনিই ইহাদের রচয়িতা হন না কেন তিনি যে শক্তির পরিচয় দিয়াছেন তাহা যে কোনও প্রথমশ্রেণীর নাট্যকারের কাম্য।” ভাসের নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার বিষয়বস্তুর ক্রমবিকাশ ও গতিবেগ। চরিত্রাঙ্কন সফলতায় ভাস অদ্বিতীয় প্রতিভার অধিকারী। দ্রুতগতির কাহিনীকাব্য সৃষ্টি করে তিনি খুব অল্পকথায় কোন বিশেষ চরিত্রের বিশেষত্ব ফুটিয়ে তোলেন। সৌন্দর্যময় কথোপকথন ও কৌতুহলী পরিবেশ সৃষ্টি করে ভাস অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে নাটকের গতিবেগকে প্রবহমান রাখেন। ভাসের মনোজগতে বাল্মিকীর মহাকাব্যের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে তাঁর রচনাবলীতে। তাই বলে তাঁর নাটক কখনো কাব্যময় হয়ে যায়নি। বরং এক্ষেত্রে তিনি তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অন্যান্য নাট্যকারদের চাইতে স্বতন্ত্র ছিলেন।
ভাস স্বভাবগত দিক থেকে পরিহাসপ্রিয় ছিলেন। তাই কখনো কখনো তিনি তাঁর রচনায় আবেগের প্রাবল্য রোধ করতে পারেননি। কোন কোন জায়গায় প্রভূত আবেগের অভিব্যক্তি হিসেবে মাঝে মাঝে তিনি অতিশয়োক্তি ব্যবহার করেছেন। ব্যঙ্গোক্তি ও ব্যাজস্তুতি রচনায় ভাস ছিলেন অসাধারণ কৌশলী। বিভিন্ন মহাকাব্যের কাহিনীতে তাঁর এই মানসিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাব রয়েছে। তিনি মাঝে মাঝে নাটকের কাহিনীতে এমন সব ঘটনার সৃষ্টি করেছেন যা অভিনব নাট্যপরিহাসের সৃষ্টি করেছে। মানবজীবন, মানসিক আবেগ, সামাজিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ইত্যাদি বিষয়ে বহু সংক্ষিপ্ত অথচ অমোঘ ও কাব্যময় পর্যবেক্ষণ তাঁর একাধিক রচনায় লক্ষ্য করা যায়। এগুলির কয়েকটি নীতিশাস্ত্রের পর্যায়ভুক্ত, কয়েকটি আবার কাব্যগুণমণ্ডিত। যেমনঃ “শত্রু দেহে আঘাত করে, প্রিয়জন হৃদয়ে।” তিনি ‘প্রতিমা’ নাটকে একাধিক অসাধারণ উপমা, রূপক, প্রবাদ-প্রবচন, অলংকারের সঠিক ও পরিমিত ব্যবহার করেছেন। রামকে বনবাসে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এসে সারথি সুমন্ত বলে- “শূন্য রথে সারথি আমি বেঁচে আছি।” ভরতকে রাজ্যভারগ্রহণ করার জন্য বললে সে বলে- “ক্ষতস্থানে আঘাত কোরো না।” এই ধরণের সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ ও আবেদনময় পংক্তি ভাসের রচনার অন্যতম অলংকার।
খ্রিস্টিয় অব্দের প্রথমদিকের শতাব্দীগুলোতে উত্তর ভারতের সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে ভাসের নাটকগুলোতে বহু তথ্য পাওয়া যায়। সমাজের বহু বিচিত্র অংশের, বর্ণের, ব্যক্তির, গোষ্ঠীর পরিচয় এখানে মেলে; যেমন- রাজা, মন্ত্রী, পুরোহিত, বন্দী, পরিব্রাজক, শিক্ষক, হস্তিপক, ভিক্ষু, গুপ্তচর, কঞ্চুকী, ব্রাহ্মণ প্রভৃতি। নারীদের মধ্যে রাণী, রাজকণ্যা এবং তাঁরা সম্পর্কিত একাধিক নারীদের কথা ভাস লিখেছেন। ভাসের রচনা থেকে আমরা জানতে পারি সেকালের নারীরা এক মুক্ত, অবাধ, স্বাধীন ও নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করতো। কোনও কিছুর অজুহাতে নারী হিসেবে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা হতনা। সেকালের সামাজিক চিত্রের অন্যতম একটি বিষয় হল ভিক্ষুকের অভাব। ভিক্ষুক শব্দ দ্বারা বর্তমানে যে কর্মজীবীদের বোঝানো হয় সে ধরণের কোন চরিত্র সেকালের সমাজে অনুপস্থিত ছিল। এটা সেকালের এক স্বচ্ছন্দ ও প্রাণোচ্ছল সমাজের চিত্র বহন করে, বোঝা যায় জীবনযাত্রার প্রবাহ এখানে সানন্দ, অবাধ ও নির্ভাবনার ছিল।
ভাসের প্রায় সব নাটকের ঘটনাপ্রবাহ সাধারণত বেশ দ্রুতগতির; কাহিনী কোথাও থেমে থাকেনা। এই প্রবহমান ঘটনারাশি অবশ্য কখনও কখনও সাহিত্যিক উৎকর্ষ প্রদর্শনের আবেগে বাধা পেয়েছে। তারপরও বলা যায়, তাঁর নাটকে ঘটনার প্রাধান্যই প্রধান। বিভিন্ন দৃশ্যাবলী ও অভিনেতাদের বর্ণনা সেখানে গৌণ; অনেকক্ষেত্রে যেখানে ঘটনাকে সাহায্য করে সেখানে ছাড়া অন্য জায়গাগুলোতে সংলাপও সংক্ষিপ্ত। ধ্রুপদী ধারার সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনায় একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তা হলো শব্দের গাম্ভীর্য। এটি পরবর্তী ধ্রুপদী সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। এর সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনায় মহাকবি ভাসের রচনাশৈলীকেই অধিকতর স্বচ্ছন্দ ও পরিশীলিত মনে হয়। তাঁর রচনায় ভাষা প্রায় সহজ, সরল, অকৃত্রিম তবে গদ্যসুলভ, তবু আবেগের গভীরতায়, অনুভূতির সারল্যে, প্রকাশের আকুলতায় এই নাটকগুলি অনেক অলংকৃত কাব্যের মহিমাকেও অতিক্রম করে যায়। অর্থের স্পষ্টতা ও ভাষার স্বচ্ছতা একটি আদর্শ কাব্যের বিশেষ গুণ। ভাসের প্রতিভায় এই বৈশিষ্ট্যটি ছিল সমুজ্জ্বল। সামাজিক কর্তব্য, মানসিক পক্ষপাত, দয়া, ভালোবাসা ইত্যাদি অনুভূতিগুলো মানুষের জীবনকে বিভিন্নভাবে দুঃখে ভারাক্রান্ত করে, এই মানবিক দায়িত্ব-বেদনার কাহিনীগুলোকে ভাস অতি সুক্ষ্ম সংবেদনশীল নিপূণতার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। ফলে তাঁর নাটকগুলো হয়ে উঠেছে এক সম্পূর্ণ পরিণত বোধদীপ্ত সাহিত্যকৃতি, প্রতিভাবান ও মহত্তম নাট্যকারের যোগ্য এক নাট্যকলা। ‘প্রসন্নরাঘব’ গ্রন্থে ‘জয়দেব’ ভাসকে দেবী সরস্বতীর হাসির সাথে তুলনা করে বলেছেন- ‘ভাসো হাসঃ’। এই উপমা যথার্থ। সুকুমারী ভট্টাচার্য মনে করেন- “ভাসের নাটকাবলিতে বস্তু ও শৈলীর সূক্ষ্মতম সামঞ্জস্যবিধানেই কাব্যলক্ষ্মীর এই সহাস্য প্রসন্নতা।”
বর্তমান সময়কালে আমরা ভাসকে ভুলে যেতে বসেছি। কিন্তু ভারতীয় নাট্যসাহিত্যের প্রথম ব্যক্তি ভাসকে অত সহজে ভুলে যাওয়া কি সম্ভব? কারণ ভাস ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর মত প্রতিভা নিয়ে এই ভূখণ্ডে খুব কম সংখ্যক নাট্যকারই জন্ম নিয়েছেন। তিনি ছিলেন বলেই আজকের নাটক সেকালে নতুন পথের দিশা পেয়েছিল। তাকে ভুলে যাওয়া অত সহজ নয়। ভাসের প্রতিভার তুলনা তাঁর সমকালে বিরল ছিল। চারপাশের নিকষ অন্ধকারের মাঝে এক দাঁড়িয়ে থেকে একাই জ্বালিয়ে রেখেছেন সংস্কৃতির প্রদীপ। তাই রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ঠাকুর বলেছেন- “কাব্যপ্রতিভার খনি উদীয়মান তরুণ কবি কালিদাস মালবিকাগ্নিমিত্র নাটকে প্রথিতযশা নাট্যকার বলিয়া যাঁহার গুণ-গরিমা স্বীকার করিয়াছেন এবং অনুকরণ দ্বারা যাঁহার সহিত প্রতিযোগিতার চেষ্টা করিয়াছেন সেই ভাসের রচনা বিষয়ে একতানতা, স্বরমাধুর্য, প্রাঞ্জলতা ও বিশুদ্ধতার প্রশংসা আর অধিক কি হইতে পারে?” আধুনিক ভারতের সকল ভাষার জননী সংস্কৃত ভাষার প্রথম নাট্যকার ভাস নাটকের ঘটনা ও ভাষা বিন্যাসরীতিতে মৌলিক কীর্তির স্বাক্ষর রেখেছেন। যা তাঁর সময়কালে অস্বাভাবিক ছিল। কাব্যপ্রতিভায়, নাটক রচনার কৌশলে অনন্য সাধারণ মেধা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ভাস এখন প্রায় অপরিচিত এটা আর কোন প্রাতিষ্ঠানিক গোপন তথ্য নয়। এ ব্যর্থতা সংস্কৃতিসেবী ও সংস্কৃতিবাদী সকলের। এ দায় পাঠকের, ধীযোদ্ধার।
