ভূর্জপত্র – সুশান্ত বর্মন

জানুয়ারি 14, 2008

আমার সংস্কৃতি আমার বোধ

প্রতিদিন যে প্রভাতকলরব আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে তা আমার স্বদেশী। আমার জীবনে বড় প্রাপ্তি এটাই যে আমি বিদেশী ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতির দাসত্ব করিনা। আমার দেশ ভেজা মাটির দেশ। এদেশের মাটি ভেজা, বাতাস আর্দ্র, চারপাশে জালের মত বিছিয়ে আছে অসংখ্য নদী-নালা-খাল-বিল। তীব্র তাপদাহ বা রুক্ষ্ম ভূমিরূপ আমার সম্পদ নয়। আমার চারপাশে সবুজ গাছের দেয়াল। চোখ বন্ধ করে দু’পা হাটলেই কোন না কোন গাছ শরীর ছুঁয়ে দেয়। আমার দেশের সবগুলো ফল রসালো। খোসা ছাড়ালেই রসে হাত ভর্তি হয়ে যায়। চুইয়ে চুইয়ে পড়ে বুক ভিজিয়ে দেয়। রসহীন সৌগন্ধহীন কোন বীজাধার আমার দেশের ফলের তালিকায় নেই। শুকনো নিরেট ফল আমাদের মুখে রোচে না। আমার দেশের গাছ নরম বাকল দিয়ে মোড়ানো। বিদেশী কন্টকময় বৃক্ষ আমার সম্পদ নয়।আমাদের গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠ বিভিন্ন রঙিন শস্য সবজিতে ভর্তি হয়ে থাকে। কাঁদামাটির সোঁদাগন্ধ আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় আমি বাঙালি। আমার দেশের আকাশের দিকে নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। অবারিত নীল রং আর সাদাকালো মেঘের অপূর্ব বিন্যাস আমাকে পাগলপারা করে দেয়। আমি বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। ভাবি এই আমার স্বদেশ, জীবন ও ভবিতব্য। ষড়ঋতুর অপার খেলায় আমার দেশ নিয়মিত রং রূপ গন্ধ পরিবর্তন করে। মায়ের স্নেহে, বোনের আদরে আমাদেরকে লালন করে। শোকে, দুঃখে, রোগে, বেদনায় পাশে এসে দাঁড়ায়। চরম ভাবাপন্ন আচরণে নয়, সহনশীল আবহাওয়ার পরশে আমাদের জীবনকে বিকশিত করে তোলে। এজন্যই কবি বলেছেন-“সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।”বঙ্গভূমির অধিবাসীরাও এদেশের মাটির মত নরম, কাদার মত পেলব মনের অধিকারী। মানুষের সুখে-তাপে, উৎসাহে জ্বরায় সকলের যে সাগ্রহ সহানুভূতি তা বিশ্বে বিরল। এখানে আমারা সকলেই সবার প্রতিবেশী, আপনজন। দশদিক বিস্তার করে রাখা প্রাকৃতিক সৌকর্যের ছায়াঢাকা শ্যামল প্রভাব এদেশের প্রতিটি মানুষের মনের প্রধান সৌন্দর্য। আমাদের আদিম ও লোকজ সংস্কৃতিতে পরহিংসা, পরনিন্দা, পরচর্চা প্রভৃতির কোন স্থান ছিল না। মতের অমিল এদেশে কখনও মনের অমিলে পরিণত হতনা। কাউকে প্রতারণা করা, আঘাত দেয়া, কারও বিশ্বাস সম্পর্কে নোংরা ও আক্রমণাত্মক মনোভঙ্গী পোষণ করা আমাদের সংস্কৃতি নয়। আমরা আত্মসমালোচনা পছন্দ করি। নিজেকে নিরন্তর খুঁড়ে খুঁড়ে মনের কালিমা দূর করে গুপ্তধন উদ্ধার করা আমাদের ধর্মবোধের প্রধান অংশ। আমরা নিজেকে বিনির্মাণ করে সাজাতে চাই আধুনিক ও সমকালীন সৌন্দর্যে। তাই আমাদের ভূমিজ ধর্মবোধের প্রাণ উচ্চারণ- “সর্বে ভবন্তু সুখীনঃ
সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ
সর্বে ভদ্রানি পশ্যন্ত
মা কশ্চিৎ দুঃখভাগ ভবেৎ।”
আমার আনন্দ যে সারা পৃথিবীতে একমাত্র আমাদের ধর্মসংস্কৃতিই পরম বিশ্বাস ও শুভবোধে উজ্জীবিত হয়ে আন্তরিক মনে উচ্চারণ করে “সকলে সুখী হোক, সকলে রোগশূন্য হোক, সকলে মঙ্গললাভ করুক, কেউ যেন দুঃখভোগ না করে”।

এমনই মরমী ও মায়াময় আমাদের ধর্মবোধ যে আমরা পরধর্মে বিদ্বেষ বলতে যা বোঝায় তা কখনও চর্চা বা পালন করিনা। আমাদের ধর্মবোধ সকলকে নিজ স্বরূপে সুগন্ধে সৌন্দর্যে বরণ করে নিতে চায়। কোন অজুহাতে, বাহানায়, অছিলায়, কারণে, নিন্দা করা নয়, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দোষ ধরা নয়, কথার ও কূট কচালের প্যাচে ফেলে কাউকে ছোট করা নয়, সকলের অন্তরে ভগবানের যে শক্তি রয়েছে, ভগবান যে স্বরূপে অবস্থান করছেন তাকে উন্মোচিত করা, বিকশিত করাই আমাদের ধর্মের অন্যতম আগ্রহ। আমরা বিদ্বেষ প্রকাশ করে নয়, ভালোবাসার সাম্যনীতি দিয়ে সকলকে বরণ করে নিতে চাই। আমাদের ধর্ম আমাদেরকে এটাই শেখায় যে-“মেরেছিছ কলসীর কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না?” আমরা কাউকে ছোট করে, হেয় করে নিজেকে বড় বলতে ইচ্ছুক নই। আমার বড় হবার গৌরব অন্যদের ছোট হবার মধ্যে নেই। সকলকে সাথে নিয়ে, সকলকে পাশে নিয়ে সকলকে স্বীকার করে, বৈচিত্র্যের মধ্যে এক সুমহান সমতরঙ্গে অবগাহন করার মধ্যেই ভারতীয় ধর্মবোধের সার্থকতা। অন্যেরা যেখানে নিজেকে বড় বলবার প্রতিযোগিতায় সারাবিশ্বে শক্তিমদমত্ততার আস্ফালন প্রকাশে প্রস্তুত তখন রবিঠাকুরের ভাবনাটিকে বারবার মনে হয়- “কত বড় আমি কহে নকল হীরাটি। তাইতো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি”।

আমাদের ধর্ম, আমাদের দর্শনবোধ, আমাদের চারপাশের প্রকৃতির প্রাণস্বরূপের মায়ায় জারিত; নন্দনবোধের মর্ম থেকে উৎসারিত। প্রকৃতিতে যেমন বিশাল মহীরুহ ও ক্ষুদ্র তৃণ নিরূপদ্রবে, নিঃসংশয়ে সমান অধিকারটি সযত্নে লালন করে ঠিক তেমনি আমাদের দর্শনবোধ। তাই প্রাচীনকালে যুগের প্রেক্ষিতে এই উপমহাদেশে ষোলটি দার্শনিক মত প্রচলিত ছিল। কাউকে বিরক্ত না করে কাউকে হেয় না করে সমানভাবে পারস্পরিক সংহতি ও সম্মানের মর্যাদায় পারস্পরিক সহাবস্থানের যে সৌন্দর্য তাই আমাদের সম্পদ। মতের, নীতির, পথের এমনকি জীবনবোধের অমিল থাকতেই পারে, একে অস্বীকার করার উপায় নেই। দুটি মানুষের চেহারা এক হয় না। দুজনের কণ্ঠস্বর, চিন্তাভঙ্গি এক নয়। প্রকৃতিতে পাখি, পশু, বৃক্ষ, কীটপতঙ্গ, মৎস্য এবং ভূমিরূপের বৈচিত্র্য পারস্পরিক সহাবস্থানে কোন রুগ্ন মানসিকতার জন্ম দেয়না, আর আমাদের দেশের আকাশ ও মেঘের রূপ তো ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। কালের রীতিকে স্বীকার করে নিয়ে আজ এই ভূখণ্ডে আমাদের সংস্কৃতিতে স্বীকৃত আছে, প্রচলিত আছে ছয়টি দর্শন। মানুষ, সমাজ, পরকাল সম্পর্কে মতের ও পথের বিভিন্নতা নিয়ে এই ষড়দর্শন এখনও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। আমাদের প্রাত্যাহিক জীবন যাপনে তাতে কোন সমস্যা হয়নি। আমাদের মাথায় বাজ ভেঙে পরেনি। আমরা অলীক আতংকে কাতর হইনি। এটাই আমাদের স্বভাব, মনোভঙ্গি। সনাতন কৃষ্টি আমাদের শৈশব থেকে এই শিক্ষাই দিয়েছে যে অপরাপর সকল মতকে আমরা অনায়াসে শ্রদ্ধা করতে পারি; সম্মান জানাতে বা প্রশংসা করতে পারি। নির্বিবাদে ভালোবেসে গ্রহণ করতে পারি। আহ্বান জানাতে পারি ভিন্নমতের সানন্দ সংমিশ্রণকে।

আমাদের এই সংস্কৃতিবোধের মূল শিকড় প্রোথিত আছে জনজীবনের লৌকিকতায়। জীবনাচরণের মৌলিকত্বে আমরা স্থানু নই। এক প্রবহমান গতিশীলতা আমাদের আছে। এই গতিময়তা দিকবিদিক নয়। এক নির্দিষ্ট গন্তব্যমুখী গতিময় জীবন আমাদের। চরাচরের যাবতীয় অমঙ্গলকে পাশ কাটিয়ে আত্মমুক্তি তথা মোক্ষলাভ আমাদের লক্ষ্য। তাই কোন নির্দিষ্ট একটি দর্শনের বন্ধনে আমরা আটকে থাকিনি। হুমায়ুন আজাদ যেমনটা বলেছেন- “এক বইয়ের পাঠক থেকে সাবধান”। আমরাও তেমনি এক বই, এক দর্শন, এক মতবাদের ঘেরাটোপে বন্দী নই। পরিবর্তিত প্রতিটি সেকেন্ড আমাদের শানিত করেছে। কালের প্রতিটি মোড়ে আমরা সংস্কৃত হয়েছি। সহস্র বৎসরের প্রতিটি বাঁকে আমরা বারবার আত্মসমালোচনার কঠিন কষ্টিপাথরে নিজেকে বিশ্লেষণ করেছি। বিনয়ের সাথে নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছি। নতুনত্বের আহ্বান স্বীকার করে নিয়ে পুরাতনকে নতুনভাবে সাজিয়ে নিয়েছি। আবার ঘুণে ধরা মনোভঙ্গী অথবা স্থবির, অনড়, অচল দর্শনকে ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করিনি। তাই আমাদের ধর্মবোধ এত প্রাণবন্ত। পাঁচ হাজার বৎসরের সুদীর্ঘ সময় পেরিয়ে বহু ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করে এখনও জীবন্ত ও বর্ধিষ্ণু এবং প্রশংসনীয়। কালে কালে আমাদের ধর্মদর্শনকে বহুবার বিদেশী নগ্ন আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিদেশী অসহিষ্ণু-বিভাষী-অসংস্কৃত-সাম্প্রদায়িক বর্বরদের আক্রমণ প্রতিহত করেই আমাদের ধর্ম জ্বলজ্বলে সূর্যের মত এখনও বিকিরিত হচ্ছে।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, শিক্ষার মৌলিকত্ব, দার্শনিক সচেতনতা, নারী স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, বিজ্ঞানচেতনা, নতুন আবিষ্কারের অভিযাত্রা আমাদেরই সম্পদ ছিল। খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগে সনাতন ধর্মসম্ভূত বৌদ্ধদর্শন পরবর্তীযুগের পিথাগোরাস, হেরাক্লিটাস, সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, কান্ট, হেগেল, জাঁ জ্যাক রুশো, ভলতেয়ার, কার্ল মার্কস, জাঁ পল সার্ত, আলবেয়ার কাম্যু. বার্ট্রান্ড রাসেল প্রমুখ দার্শনিকদের চেতনায় নবচিন্তার সঞ্চার করেছে। তাঁরা ভারতীয় দর্শনের মানবিকতা, যৌক্তিকতা ও সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে পরবর্তী যুগের সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও সামাজিক বিনির্মাণে।

সমকালীন চাকচিক্যময় রঙিন হাতছানি নয়, বিদেশী সংস্কৃতির সেবাদাসী নয় সত্যিকারের নারী স্বাধীনতাকে ধারণ ও লালন করত সনাতন ধ্রুপদী সমাজ। এখনকার মত পণ্যে পরিণত, ভোগবিলাসী নারী নয় মৌলিক জ্ঞান অনুসন্ধিৎসু নারীরাই ছিল আমাদের সম্পদ। সেকালের সমাজ ব্যবস্থা নারীদের নায়িকা নয় জ্ঞানী হতে উৎসাহ দিত। প্রাচীন ভারতবর্ষে ‘কাক্ষীবতী’, ‘ঘোষা’, ‘মৈত্রেয়ী’, ‘অপালা’, ‘বাক্’, ‘গার্গী’, ‘সুলভা’, ‘ব্রহ্মবাদিনী’ প্রমূখ নারীরা আজীবন জ্ঞানচর্চা করে গেছেন। মহাগ্রন্থ বেদের একাধিক সুক্ত বা ঋক্ বা শ্লোক নারীদের দ্বারা রচিত। পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের মধ্যে একমাত্র আমাদের ধর্মগ্রন্থেই নারীদের সরব, সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ রয়েছে। বেদান্তের ‘সোঅহম’ (আমিই সেই) এবং ‘তত্ত্বমসি’ (তুমিই সেই) মন্ত্রটির রচয়িতা ছিলেন প্রখ্যাত অম্ভ্রণ ঋষির কন্যা ‘বাক্’। মহানির্বাণতত্ত্ব থেকে জানি নারীরাও উপনয়ন প্রাপ্তের অধিকারী ছিল। এছাড়াও বেদ-পুরানে ‘মুদগালিনী’, ‘বিশপলা’, ‘বধ্রিমতী’ প্রমুখ নারী যোদ্ধাদের বীরত্বের কথা সগৌরবে উল্লেখ আছে। বিভিন্ন বিদেশী নারীবিদ্বেষী অপসংস্কৃতির প্রভাবে আমরা এই উদারবাদী সংস্কৃতিকে আর ধারাবাহিক রাখতে পারিনি। বিদেশী সংস্কৃতির কুটিল প্রভাবে আমাদের নারীরাও ঘরের ঘেরাটোপে বন্দীত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। তথাকথিত শান্তির ললিত বাণী আজও তাদেরকে মুক্ত করতে পারেনি।

বর্তমানের পরমতঅসহিষ্ণু, আক্রমণপ্রবণ তথাকথিত গণতন্ত্র নয়, সত্যিকারের বহুমত ও পথের লালনকারী গণতন্ত্রের চর্চা সনাতন ধর্মই পৃথিবীতে উপহার দিয়েছে। ভাববাদ, যুক্তিবাদ, যোগ, শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব, সাংখ্য, পাতঞ্জলী প্রভৃতি জ্ঞান, অনুভূতি ও উপলব্ধির বিভিন্ন ধারা সমান্তরালভাবে পথ চলেছে এই সনাতন সমাজেই। নিজেকে চর্চা, লালন, পালন ও প্রচার করেছে নিঃসংকোচে, নির্ভয়ে। প্রাচীনকালের প্রতিটি আশ্রম ছিল এক একটি জ্ঞানকেন্দ্র। শিক্ষার্থীরা নতুন চিন্তা ভাবধারার সাথে পরিচিত হত। তারা শিখতো জানতো যে মানুষের প্রাত্যাহিক জীবনের যাবতীয় হিংস্রতা, অশ্লীলতা, কুটিলতা থেকে নির্বাণ লাভই উদ্দেশ্য। মত ও পথের রূপভিন্নতা পারস্পরিক সংঘাতকে কখনও উস্কে দেয়নি। বরং যুক্তির নিগুঢ় ও তীব্র আলোয় পরস্পরকে যাচাই-বাছাই করার এক নির্মল ও উন্মুক্ত পরিবেশ ছিল সেকালের সনাতন ধ্রুব সমাজে। পুরাণ ও মহাভারত-রামায়নে উল্লেখিত বিভিন্ন আকাশযান কিংবা যুদ্ধাস্ত্রগুলো ছিল বৈজ্ঞানিক বিকাশের চরম অগ্রগতির প্রমাণ। আকাশযানের বিভিন্নতা ও যুদ্ধাস্ত্রের বৈচিত্র্য প্রমাণ করে সেকালে বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার ও শিল্পকারখানার সংখ্যা অসংখ্য ছিল।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ঘটেছিল বিভিন্ন বিষয়ের অগ্রগতি। শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে মানুষের ভাঙা হাড় ধাতব বস্তু দিয়ে জোড়া লাগানো এমনকি বিচ্ছিন্ন অঙ্গ প্রতিস্থাপন পর্যন্ত সম্ভব করেছিল প্রাচীন চিকিৎসকেরা। অশ্বিনী ভ্রাতৃদ্বয়ের চিকিৎসাজ্ঞান এখনও ফিকে হয়ে যায়নি। ধন্বন্তরির কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে আধুনিক সব রোগের নাম। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র এখন হার্বাল চিকিৎসার রূপে নতুন আঙ্গিকে সারা পৃথিবীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাৎসায়নের কামশাস্ত্র আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নির্ভুল ও আধুনিক যুগেও প্রয়োগযোগ্য।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও চাণক্যের রাষ্ট্রতত্ত্ব আধুনিক যুগের রাষ্ট্রকাঠামোতেও অপরিহার্য। এই প্রাচীন জ্ঞানের নির্যাস গ্রহণ করেই আধুনিক যুগের মেকিয়াভেলি, হবস, লক প্রমুখ প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ঋদ্ধ হয়েছেন।

পণ্ডিত পানিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাকরণবিদ। তিনি সংস্কৃত ব্যাকরণকে যেভাবে ও যেরূপে বিধিবদ্ধ করে গেছেন তা এখনও অনস্বীকার্য।

সেকালের ধাতুশিল্প ও স্থাপত্যশিল্প যে উৎকর্ষের শিখরে আরোহন করেছিল তার প্রমাণ বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উদাহরণে আছে। প্রাচীনকালের বিভিন্ন প্রতিমা, ভাস্কর্য, যানবাহন, গৃহ বা দুর্গ ইত্যাদির নির্মাণশৈলী ও নন্দনতাত্ত্বিক সৌন্দর্য আজও বিশ্বের বিস্ময় উদ্রেক করে। মানুষ অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে অনুভব ও উপলব্ধি করে প্রাচীন সনাতন ধর্মের সেই উদার আবহাওয়াকে যে এমন রত্নরাজি ধারণ ও উপহার দিতে পারে।

সারা পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডারে এথিকাল এপিক রয়েছে মাত্র চারটি। মহাভারত, রামায়ণ, ইলিয়াড এবং ওডেসী। এর মধ্যে দুটি হোমারের লেখা আর বাকী দুটি আমাদের।

বস্তুত আড়াই হাজার বছরের পুরাতন কোন সজীব বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য অন্য কোন জাতিগোষ্ঠী বা সংস্কৃতির নেই। বিশ্বের অসংখ্য ধর্মমত, সংস্কৃতি নিজেদের কল্পিত শ্রেষ্ঠত্ব উচ্চকণ্ঠে প্রচার করতে করতে উন্মাদপ্রায় কিন্তু সম্পদের দীনতা তাদের সেই অহংকারকে প্রশ্রয় দেয়না। ফলে তারা আশ্রয় নেয় হিংসার। জোর করে মানুষকে নিজ স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করাতেই তাদের মানসিক তৃপ্তি। বিপরীতে আমরা আত্মপ্রচার করিনা। প্রচারবিমুখ জাতি আমরা। নিরিবিলি জ্ঞানচর্চাকে আপন করেই আমরা জীবন সার্থক করতে চাই। তাই বলে সম্পদের ঐশ্বর্যে আমরা দীনহীন নই। বিজ্ঞাপনের কৃত্রিম আলোয় আমরা রাঙানো নই। আত্মতৃপ্তির মায়াজালে আমরা বিমোহিত নই। তাই সহস্র বৎসরব্যাপী সগৌরবে সনাতন ধর্ম, আমাদের সংস্কৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাহিত হয়ে এসেছে।

আমরা দেশজ চেতনায় নবজীবন লাভ করতে চাই। বিদেশী-বিভাষী-অসংস্কৃত-আক্রমণবাদী দর্শন আমার নয়। সংস্কৃতি-ধর্মের সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকায় আমরা অস্বস্তি বোধ করি। আমাদের ধর্ম-সংস্কৃতি সাম্রাজ্যবাদী ধারণাকে সমর্থন করে না। অপরের সংস্কৃতিকে গ্রাস করার মনোভঙ্গি লালন করেনা। কাঁদা ছিটিয়ে পরিবেশ নোংরা করার শিক্ষা দেয়না। অপরের ঐশ্বর্য আমাদের মনে ঈর্ষার জন্ম দেয়না। অপরের সমৃদ্ধি আমাদেরকে কাতর করেনা। আমাদের সংস্কৃতি বরং সকলের অন্তর্গত শুভ নির্যাসকে আত্মস্থ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে চায়।

আমাদের দেশের উর্বর পলল মাটির মতই আমাদের সংস্কৃতিও সারবান। আমাদের চিন্তা-চেতনা বন্ধ্যা নয়। নিরন্তর পরিশীলন, পরিমার্জনের মাধ্যমেই আমরা সংহত, সংযত হই। তাই আমাদের সংস্কৃতিতে অপরকে গ্রাস করবার মানসিকতা নেই। বরং আত্মতৃপ্তির ফাঁদে যেন বন্দী হয়ে না যাই তার প্রেরণা আমাদের রয়েছে।

‘ধর্ম’ শব্দটির সংজ্ঞা এবং অনুভব আমাদের কাছে প্রচলিত অর্থগত সীমানার চাইতেও বিশাল। ‘ধৃ’ ধাতুজাত শব্দ ‘ধর্ম’। এর অর্থ ‘যা ধারণ করে’। বিদেশী-বিভাষী সংস্কৃতি প্রদত্ত ‘ধর্ম’ শব্দটির সংজ্ঞার সাথে আমাদের উপলব্ধ সংজ্ঞার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে। অন্যান্য ধর্মমতের ক্ষেত্রে দেখা যায় মানুষ নিজেই ধর্মকে ধারণ লালন ও পালন করে। মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, আগ্রহ-বিরুদ্ধতার উপর ধর্মের প্রবহমানতা নির্ভর করে। কিন্তু আমাদের কাছে ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থ ভিন্নরূপ। আমাদের দর্শনে মানুষ ধর্মকে নয় বরং ধর্মই মানুষকে ধারণ লালন পালন করে। মানুষের সুখে-দুঃখে, আনন্দে-বিপদে সখা বা পরিত্রাতারূপে ধর্ম পাশে এসে দাঁড়ায়। মানুষের ইচ্ছা-রুচি বা পক্ষপাতের উপর ধর্মের সচল থাকাটা নির্ভর করেনা। ধর্ম নিজগুণেই সজীব থাকে; মানুষের পাশেপাশে ছায়ার মত, আশ্রয়ের মত বিরাজ করে। এজন্যই সনাতন ধর্ম অজর, অক্ষয়। এখানেই সনাতন ধর্মের সার্থকতা। সনাতন ধর্ম কিছু নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বা বিধিবদ্ধের আঙ্গিকে বৈশিষ্ট্যকেন্দ্রিক নয়। বরং ধর্মের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তা অনেকাংশেই সাংস্কৃতিক রূপ লাভ করেছে। তাই সনাতন ধর্ম শুধুমাত্র রিচুয়াল নয় তার চেয়েও বেশি কিছু। এজন্যই সনাতন ধর্ম কোন অজুহাতেই মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে অবদমিত রাখেনা। নাচ, গান, নাটক, কবিতা, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি তথা ললিতকলা ও মানববিদ্যার সব শাখারই মুক্ত ও অবাধ বিচরন সনাতন ধর্মের অঙ্গে অবারিত। মানুষের মুক্ত জীবনবোধ ও জীবনজিজ্ঞাসাকে সনাতন ধর্ম কোন অছিলাতেই আক্রমণ করেনা। বরং মুক্তচিন্তার আলোয় চারপাশ আলোকিত করে। আমাদের আনন্দ এখানেই যে আমরা সনাতন ধর্মের মুক্ত, অবাধ, উদার, বিস্তীর্ণ নিসর্গের বাসিন্দা। আমাদের মন ও চিন্তা অর্গলবদ্ধ নয়। পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও সামাজিকতা আমাদের প্রধান সহায়। এখানেই সনাতন ধর্মের পাঁচ হাজার বছরের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমার আসল রহস্য নিহিত।

No Comments Yet »

কোন মন্তব্য নেই এখনও

RSS এই লেখাটির জন্য করা মন্তব্যের স্রোত। TrackBack URI

মন্তব্য দিন

Blog at WordPress.com.