ভূর্জপত্র - সুশান্ত বর্মন

ফেব্রুয়ারি 21, 2008

সমকাল দিগন্তে

যার অধীনে আছে: গল্প — susanta @ 10:01 pm
Tags:
সমকাল দিগন্তে
সুশান্ত বর্মন

অন্ধকার যে এত গাঢ় হতে পারে সুখ তা জানতো না। এতক্ষণ ধরে সুখ মনে করছিল যে সে বোধহয় অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড অন্ধকার তাকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য করে দিচ্ছে আলোর কাছ থেকে। সে আঁধারে হারিয়ে যেতে চায় না। অথচ এই নিবিড় আঁধারকে আজ তার বড় আপন মনে হচ্ছে। যেন নিজেকে আঁধারের এই গাঢ় কালোর সাথে একাত্ব করে দিতে পারলে বড় ভালো হতো। কিন্তু মানুষের মন যা চায় তা কখনোই বাস্তব হয় না। কিসের হল্কায় যেন চারিদিকের আঁধারটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হতে শুরু করল। আস্তে আস্তে আশেপাশের সব কিছু দৃশ্যমান হচ্ছে। সুখ মনে মনে প্রার্থনা করা শুরু করল-‘এই আঁধার যেন না কাটে, অনন্তকাল ধরে সারা পৃথিবী জুড়ে এই অপার্থিব আঁধার তার কালো দেহ ছড়িয়ে দিক। আমি আলোয় যেতে চাই না। আমি আলোয় ভাসতে চাই না।’

সম্ভবত প্রথার প্রতি সম্মান দেখিয়েই সুখের প্রার্থনা মঞ্জুর হল না। একটি দীর্ঘ রাত যেন কেটে গেল। ভোরের প্রভা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

গতকাল হলে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো। মাত্র এক রাতের ব্যবধান। তাতেই সমস্ত কিছু ওলটপালট হয়ে গেল। প্রচন্ড আলোর ঝলকানি সুখের সারা দেহমনে ছুটে চলতো। সে ছিল সজীব, উচ্ছল, উৎসাহী। আনন্দের সপ্তম স্বর্গে ছিল তার মুখর পদচারণা। বন্ধূদের বলতো-‘গতিতে জীবন মম, স্থিতিতে মরণ’
কিন্তু আজ বিষাদের হেমলক সে নিজহাতে মুখে তুলে নিয়েছে। জীবনের প্রথম চাওয়া যখন মিথ্যে হয়ে গেল; তখন আর সে কিছু ভাবতে পারল না। যে আলোর ছটা তাকে প্রচণ্ড আকর্ষণ করেছিল, তার কাছে ছুটে যেতেই সে এক অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেল। নিরেট সে দেয়াল। চোখে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু সে মর্মে মর্মে অনুভব করলো দেয়ালটা বিশাল আকাশ ছোঁয়া। তবুও বিপুল সাহসে দেয়ালের উপরে দাঁড়িয়েছিল ওপারে নামবে বলে। কিন্তু আলোটির উজ্জ্বলতা ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। এক সময় দমকা বাতাসে আলোর উৎসটাই গেল নিভে। ধক্ করে বুকে ধাক্কা লাগল সুখের।
‘না, না, না, না’
চীৎকার করে উঠতে চেয়েছিল। কিন্তু গলা দিয়ে কোন স্বর বেরোয়নি। মিলিয়ে যাচ্ছিল সব কিছু চোখের সামনে থেকে। এক সময় সম্বিত ফিরে পেতে দেখে সে একা। বড় একা। বিশাল পৃথিবীটা যেন এক মুহুর্তেই সমতল মাঠে পরিণত হয়েছে। বহু দুরে কয়েকটি মাত্র বিবর্ণ গাছ। এছাড়া কোথাও কেউ নেই। শুধু সে। সম্পূর্ণ একা।

আর ভাবতে চায় না সুখ। সমস্ত শরীর তার কেঁপে উঠে দমকে দমকে। আর ভাবতে চায় না সে। তবুও বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠে আলোকণাটির ঠাণ্ডা সৌম্য ছবি। তার সমস্ত উত্তাপ যেন শুষে নিয়েছিল। তার শরীর ভরে গিয়েছিল অসংখ্য ভালো লাগায়। আলোটাকে নিজের করে পাবার ইচ্ছেটা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছিল তার বুক জুড়ে।

সুখ চোখ মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়ে। নিজের অক্ষমতার স্বরূপ তার উপলব্ধির সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরে উড়ে যায়। হুহু করে লু হাওয়া বয়ে যায় তার শরীর দিয়ে। দূর থেকে দেখে মনে হয় সে যেন এক খণ্ড পাথরে পরিণত হয়েছে। চারিদিক স্তব্ধ নিথর। কোথাও কোন সাড়াশব্দ নেই।
অনেকক্ষণ পর সে নড়ে ওঠে। সে চোখ তুলে তাকায়। অবাক হয়ে লক্ষ্য করে এখনও সূর্য উঠেনি। ভোরের আলোর জ্যোতি চারিদিকে প্রভাতের আগমনী সঙ্গীত গাইছে। কিন্তু আলোটা ক্যামন যেন ধুসর। অন্ধকার পুরোপুরি দূর হয়নি। আবছা অন্ধকার চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। সুখ নির্মম সূর্যের অপেক্ষা করতে থাকে । অপেক্ষার মুহুর্তগুলো কেটে যায় ধীরে ধীরে। কিন্তু সূর্যের অট্টহাসি শোনা যায় না। সুখ বুঝতে পারে ছন্দের সুর কেটে গেছে। সে জানে ক্ষতটা কোথায়। ইচেছ করলেই জোড়া দেয়া যায়, দিতে পারে সে কিন্তু সম্ভব নয়। জোড়া দেয়ার চেষ্টা করলেই হাজারটা চোখ তার দিকে আগুন ছুড়ে দেবে। তাও সে উপেক্ষা করতো যদি আলোটা নিভে না যেত।

“কেনো আমি আলোটাকে থামাতে যাইনি? কেনো আমি তাকে নিভতে দিলাম? আমার মধ্যে কি পিছুফেরা মন আছে?” হাহাকার করে ওঠে সুখ। চারিদিকের অবস্থা দেখে সূর্যের ক্ষীণ আলোকেও তার প্রকট বলে মনে হয়।

অবশেষে সুখ উঠে দাঁড়ায়। যতদূর চোখ যায় আলোময় সীমাহীন প্রান্তর তাকে ব্যঙ্গ করে। চারিদিকে খুঁজতে খুঁজতে একসময় একটা স্বস্তির স্পর্শ খুঁজে পায় সে।

“ওই তো; বহুদূরে এক জায়গায় অন্ধকার যেন জমাট বেঁধেছে। ওটাই, ওটাইতো আমার কাঙ্খিত পৃথিবী।”

চারিদিকের সামান্য আলোও এখন তার কাছে অসহ্য মনে হয়। সুখ অন্ধকারকে সামনে রেখে হাটতে শুরু করে । এক সময় পৌঁছেও যায়। কতক্ষণ পরে তা সে বলতে পারে না, পারবেও না। কারণ সময়ের প্রয়োজন তার কাছে অতীত হয়েছে। কিন্তু আঁধারের রাজ্যে প্রবেশ করতেই সে থম্কে যায়। তাকিয়ে দেখে এক প্রজ্জ্বলিত রঙধনু সমস্ত আঁধারের রাজ্যে ছড়িয়ে আছে। ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে সুখের দেহে। যেখানে রঙের লেশ আছে সেখানে তার আস্থা নেই। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার সে চলা শুরু করে অজানা আঁধারের সন্ধানে। আঁধারকে তার খুঁজে বের করতেই হবে।

সুখ হাঁটতে থাকে। হাঁটতেই থাকে। আঁধারের প্রত্যাশা তাকে ব্যাকুল করে তোলে। তাই হাঁটতে থাকে। হাঁটতেই থাকে। এক সময় তার দেহটা ছোট হতে হতে দিগন্তে মিলিয়ে যায় ।

কোন মন্তব্য নেই »

কোন মন্তব্য নেই এখনও

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

মন্তব্য দিন

Blog at WordPress.com.