ভূর্জপত্র - সুশান্ত বর্মন

মার্চ 8, 2008

কবিতার্কিক কথা

কবিতার্কিক কথা
সুশান্ত বর্মন

বাংলা সহ ভারতীয় একাধিক ভাষার আদি ভাষা সংস্কৃত। কালের বিবর্তনে সংস্কৃত ভাষা বিভিন্নরূপে বিবর্ধিত হয়ে অপভ্রংশ রূপ লাভ করে এবং তা থেকে বিকশিত হয় বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষাকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হলে, ভালোবাসতে হলে সংস্কৃত ভাষার প্রতিও আগ্রহ থাকতে হবে। কিন্তু সমকাল বলে ভিন্ন কথা। এখন এদেশে বিদেশী নীতির মাপে স্বদেশী সংস্কৃতি মূল্যায়িত হয়। ফলে বিদেশী আদর্শ, দর্শন, মনোভঙ্গি, নীতিবোধ, জীবনযাত্রা ইত্যাদির কাছে এমনভাবে দায়বদ্ধ হয়ে গিয়েছে যে আমাদের সাংস্কৃতিক মৌলিকত্ববোধ হারিয়ে গেছে। বিদেশের কাছে স্বদেশী নীতি বিক্রি করে দেয়া এই আমরা তাই সুখ্যাত বাঙালি নাট্যকার রঘুনাথ কবিতার্কিকের নাম জানবোনা এ আর বিচিত্র কি? অথচ মধ্যযুগীয় বাঙালিদের মধ্যে একমাত্র রঘুনাথই সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। সে যুগে রঘুনাথই একমাত্র নাট্যকার যিনি পূর্ববর্তী সাহিত্যিকদের প্রভাবকে সযত্নে পাশ কাটাতে পেরেছিলেন। সপ্তদশ শতকীয় বিদেশী সংস্কৃতিবাহী সামন্ত শাসক বেষ্টিত দেশে বাস করেও রঘুনাথ নিজ জাতি-ধর্ম-সংস্কৃতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। বরং সার্বিক সীমাবদ্ধতার কালো অন্ধকার দূর করে মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ চেয়েছেন।

আধুনিক নোয়াখালী জেলার অন্তর্গত প্রাচীন ‘ভুলুয়া’ রাজ্যের অধিপতি ছিলেন রাজা লক্ষণমাণিক্য। তাঁর সময়কাল ছিল ১৬০৫-১৬৪০। রাজা লক্ষণমাণিক্যের রাজপুরোহিত ছিলেন রঘুপতি, কারো মতে সভাকবি আবার কারো মতে মন্ত্রী। রাজা লক্ষণমাণিক্য প্রাচীন বাংলার সেনরাজ লক্ষণসেনের মত গৌরবের অধিকারী হবার জন্য তাঁর রাজসভায় পঞ্চরত্নের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। এরা হলেন রঘুনাথ কবিতার্কিক, রামচন্দ্র তর্কপঞ্চানন, রামভদ্র সার্বভৌম, রতিদেব তর্কসিদ্ধান্ত এবং রঘুনাথের পুত্র রত্নেশ্বর বিদ্যাবাগীশ। এদের মধ্যে রঘুনাথ নিজগুণে প্রখ্যাত হয়েছেন।

একাদশ শতক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে বিদেশী-বিভাষী আক্রমণ ও শাসন শুরু হয়। ফলে উপমহাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ও ধর্মবোধে এক অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ধাক্কা লাগে। ফলে শুরু হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন মধ্যযুগের দীর্ঘ কালরাত্রি। এই সময় ভারতীয় উপমহাদেশের সবকটি ভাষায় সাহিত্যরচনার পরিমাণ কমে যেতে থাকে। প্রজা-ধর্ম-সংস্কৃতি নিপীড়ক শাসকেরা বিদেশী-অক্ষরজ্ঞানহীন-ভিন্নধর্মী ও অসংস্কৃত হওয়ায় তারা ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্য শিল্পবোধের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারেনি বা করতে চায়নি। নিজের বিনোদন ও শাসন ধরে রাখার কাজেই তারা ব্যস্ত থাকতেন। এর প্রভাব এত বেশি যে রঘুনাথ তাঁর হাতের কাছে যে কয়েকটি সংস্কৃত প্রহসন পেয়েছিলেন তার মধ্যে সবচেয়ে শেষেরটি লিখিত হয়েছিল ১৩-১৪ শতকে। দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতির মান এত নীচু ছিল যে ১৩-১৪ শতকের পর থেকে পরবর্তী কয়েক শতকে নতুন কোন নাটক লেখা হয়নি। ভারতীয় উপমহাদেশের আকাশে বিস্তার করে থাকা কয়েকশত বৎসরের দীর্ঘ সাহিত্যিক বন্ধ্যাত্ব স্থায়ী হয়নি যে সব মেধাবী ও স্বদেশপ্রেমী সাহিত্যিকদের কারণে তাঁদের মধ্যে রঘুনাথ অন্যতম। কবিতার্কিক তাঁর উপাধি। রঘুনাথ যে কালে জীবন যাপন করেছেন সেকাল ছিল মধ্যযুগেরই শেষ ধাপ। সমকালের বিরূপ রাজনৈতিক প্রভাবে অন্য সাহিত্যিকদের মতো তাঁরও সাহিত্য রচনার পরিমাণ খুব কম ছিল। মতান্তরে তাঁর রচিত একটি বাদে সবগুলি গ্রন্থ কোন দুর্যোগে নষ্ট হয়ে গেছে। এজন্য অনেক খুঁজেও তাঁর একাধিক কোন রচনা বা গ্রন্থ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তাঁর একমাত্র প্রাপ্ত গ্রন্থটির নাম ‘কৌতুকরত্নাকর’; এটি একটি প্রহসন। সেকালের সাহিত্যরচনার রীতি অনুযায়ী কবিতাকারে লিখিত। অর্থাৎ রঘুনাথ কবিতার্কিককে একই সঙ্গে নাটক, নাটকের একটি বিশেষ ধারা প্রহসন এবং কবিতা সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখতে হয়েছিল। সংস্কৃত ভাষায় লিখিত নাটকটি সেকালের বাঙালী মণীষার একটি ধীজ্ঞান নিদর্শণ।

দৃশ্যবৈচিত্র্যে কৌতুকরত্নাকর প্রহসনটি ছয়টি ভাগে বিভক্ত। এর কাহিনী সংক্ষেপে এরূপ- চোরে রাণীকে চুরি করে নিয়ে গেছে। একথা শুনে রাজা ভয়ে পালাতে চায়। মন্ত্রী তাকে থামায়। মন্ত্রীর পরামর্শে রাণীকে খুঁজতে সৈন্য পাঠানো হয। এদিকে বসন্ত উৎসব সামনে এসে গেছে। এ উৎসব না করলে রাজার মান থাকেনা, আবার রাণী ছাড়া বসন্ত উৎসব করাও সম্ভব নয়। অতএব মন্ত্রীর পরামর্শে নগর বারাঙ্গনাকে রাণীর আসন গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রন জানানো হয়। বারাঙ্গনা অনঙ্গতরঙ্গিনী রাজার কাছে আসার সময় বসন্ত উৎসব উপলক্ষে আগত রাজগুরুর দেখা পায়। রাজগুরু বারাঙ্গনার রূপ দেখে তার প্রণয় কামনা করে। কিন্তু অনঙ্গতরঙ্গিনী রাজী হয়না। গুরু জোর করতে গেলে অনঙ্গতরঙ্গিনী তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করে আহত করে ফেলে চলে যায়। এদিকে চোরের সন্ধানে বের হওয়া সৈন্যরা গুরুকে এ অবস্থায় দেখে তার কারণ জানতে চায়। গুরু নিজের ব্যর্থতার কথা ভেবে চুপ থাকে। তখন সৈন্যরা মনে করে সেই রাণীকে চুরি করেছে। গুরু একথারও কোন উত্তর দেয়না। সৈন্যরা তখন গুরুকে গ্রেফতার করতে চায়। গুরু বাধা দিলে সৈন্যদের আঘাতে অজ্ঞান হয়ে পরেন। গুরু মারা গেছে ভেবে সৈন্যরা পালিয়ে যায়। গুরু জ্ঞান ফিরে পেয়ে রাজার কাছে গিয়ে নালিশ করে। সৈন্য সমরকাতর রাজার কাছে গুরুর শারীরিক আঘাতের চিহ্নের বর্ণনা দিয়ে বলে যে সে ভেবেছে রাণীর আঘাতে গুরুর এ দশা হয়েছে অর্থাৎ তিনিই রাণীকে চুরি করেছেন। রাজা গুরুর শরীরের আঘাতের চিহ্নগুলোর কারণ জানতে চাইলে তিনি অনঙ্গতরঙ্গিনীর কথা বলতে লজ্জা পান এবং নীরব থাকেন। তখন সকলে মিলে সাব্যাস্ত করে যে গুরুই রাণীকে চুরি করেছেন। এজন্য তাকে শূলে চড়ানোর আদেশ দেয়া হয়। পরে অবশ্য রাণী ফিরে আসেন এবং আসল চোরও ধরা পড়ে।

সমাজসচেতন রঘুনাথ তাঁর চারপাশে যা দেখেছেন তাই তাঁর রচনায় সাহিত্যরূপ লাভ করেছে। সমকালের নীতিহীন শাসকদের মনোভঙ্গি ও জীবনকাহিনী নির্বাচন করেছেন কৌতুকরত্নাকর প্রহসনটির জন্য। তাঁর কৌতুকপ্রবণ মনের পরিচয় চরিত্রগুলোর নামকরণে পরিস্ফুট। রাজা- দুরিতার্ণব, রাণী- লাবণ্যবঞ্চিতা, মন্ত্রী- কুমতিপুঞ্জ, সেনাপতি- সমরকাতর, রাজদৈবজ্ঞ- অশুভচিন্তক, রাজবৈদ্য- ব্যাধিবর্ধক, বারাঙ্গনা- অনঙ্গতরঙ্গিণী, জ্যোতিষশাস্ত্রকার- অক্ষরগোমাংসমিশ্র ইত্যাদি। তিনি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে সামাজিক বাস্তবতাকে প্রকাশিত করতে চেয়েছেন। রসিকতার আড়ালে স্পষ্ট করতে চেয়েছেন প্রাত্যাহিক নৈতিক পরিচিতিকে। তাঁর মেধাবী কুশলতায় কৌতুকরত্নাকর নাটকটি শুধুমাত্র কৌতুকপ্রবাহে ব্যস্ত থাকেনি; বরং হাস্যরসের নির্মোহ বর্ণনার সাথে সাথে উন্মোচিত করেছে সেকালের রাজাদের গণবিচ্ছিন্ন মনোভাব এবং মন্ত্রী অমাত্যদের কপট দেশপ্রেমের চুলচেরা বাস্তবতাকে।

প্রাত্যাহিক জীবনযাত্রায় রাজারা একালের মত সেকালেও নীতিহীন, বিবেচনাহীন, আবেগসর্বস্ব মনোভঙ্গি পোষণ করতো। সমাজসচেতন রঘুনাথের সতর্কদৃষ্টি তা উপেক্ষা করেনি। তিনি শুভবুদ্ধির উদয় চেয়েছেন, আশা করেছেন দেশপ্রেমহীন, প্রজাপীড়ক, অপচয়কারী, বিনোদন বিলাসী রাজার বিনাশ। দেশের নাগরিকের সার্বিক মঙ্গল। এজন্য তিনি প্রহসনের আশ্রয়ে উন্মোচন করেছেন কালিক সত্যকে, সামাজিক বৈচিত্র্য ও বাস্তবতাকে।

কোন মন্তব্য নেই »

কোন মন্তব্য নেই এখনও

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

মন্তব্য দিন

Blog at WordPress.com.