ভূর্জপত্র - সুশান্ত বর্মন

এপ্রিল 13, 2008

সিন্দুরমতি পুকুরের কথা

যার অধীনে আছে: বিবিধ, ভ্রমণ — susanta @ 9:30 pm
Tags: ,

সিন্দুরমতি পুকুরের কথা

সুশান্ত বর্মন

সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক রহস্যময় ও বিখ্যাত পুকুর রয়েছেসাধারণত এই পুকুরগুলোকে ঘিরে বিভিন্ন রকম উপকথা, পৌরাণিক কাহিনী এলাকায় প্রচলিত থাকেরাজারহাট থানার পাশের সিন্দুরমতি পুকুরটিও তেমনি একটি পুকুররাজারহাট থানা সদর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার উত্তরে সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর মাঝে এই বিশাল পুকুরটির অবস্থানএর প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন ঐতিহাসিক তারিখ পাওয়া যায়নাতবে এলাকার বয়োবৃদ্ধ প্রাজ্ঞ ব্যক্তিগণের সাক্ষ্য থেকে জানা যায় স্মরণাতীত কাল থেকে পুকুরটি এই এলাকার জনগণের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে

পুকুরটিকে ঘিরে একটি প্রাচীন কাহিনী এলাকার ভক্তিপ্রবণ মানুষেরা বংশ পরম্পরায় পরম শ্রদ্ধায় বহন করে আসছেনলোককথায় জানা যায় প্রাচীনকালে শ্রীলংকায় শ্রী রাজ নারায়ণ চক্রবর্তী নামে একজন ধনবান জমিদার ছিলেনতিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিকতাঁর স্ত্রী শ্রীমতি মেনকা দেবীও ছিলেন ধর্মগত প্রাণতাঁরা দুজনই দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেনতাঁদের আশ্রয়ে প্রজারা সুখে শান্তিতে বসবাস করলেও নিজেদের মনে কোন শান্তি ছিল নানিঃসন্তান জমিদার দম্পতি তাই দিনরাত বিষাদের ছায়াঘেরা রাজ্যে বসবাস করতেনতারা মাঝেমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন তীর্থস্থান ভ্রমণ করতেনএরকমই একবার তীর্থস্থান ভ্রমণ করতে করতে তাঁরা রাজারহাট থানাধীন উক্ত গ্রামে এসে অবস্থান করেনএই গ্রামের গাছপালাঘেরা শান্ত সমাহিত রূপ জমিদার দম্পতির মনকে আবিষ্ট করে ফেলেতাঁরা বাকী জীবন এখানেই কাটিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেনজমিদার শ্রী রাজ নারায়ণ চক্রবর্তী নিরন্তর প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন জমিদারী স্থাপন করেনএখানে জমিদারপত্নী মেনকা দেবী ঈশ্বরের কৃপায় দুটি সুন্দর কন্যার জন্ম দেনপবিত্র দিনে তাদের নাম রাখা হয় সিন্দুর ও মতিজমিদারের এই সুখী সমৃদ্ধ জনপদে হঠাৎ দুর্ভোগের কাল মেঘ ঘনিয়ে এলহঠাৎ এই রাজ্যে প্রচণ্ড খরা দেখা দেয়এলাকার খাল বিল সব তীব্র রোদে শুকিয়ে গিয়ে পানীয় জলের প্রচণ্ড অভাব দেখা দেয়অনেক প্রজা জলের অভাবে মারা যেতে থাকেএমন অবস্থায় প্রজাহিতৈষী জমিদার তার রাজপ্রাসাদের অনতিদূরে প্রায় ১৭ বিঘা জমির উপর এক সুবিশাল দিঘি খননের পরিকল্পনা করেনউড়িষ্যা থেকে নিয়ে আসা হাজার হাজার শ্রমিক কয়েক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে পুকুরের কাজ সমাপ্ত করেকিন্তু আশ্চর্য এক ফোঁটা জল পুকুরের তলদেশ থেকে উঠে এলনাজমিদার স্বপ্নাদেশ পেলেন - তোর দু কন্যা সিন্দুর ও মতিকে দিয়ে জল বিহীন পুকুরের তলদেশে যথারীতি পূজা-অর্চনা করালে নতুন পুকুরে জল আসবে ভগবানের আদেশ পেয়ে জমিদার চৈত্র মাসের নবমী তিথিতে পূজানুষ্ঠানের আয়োজন করলেনসিন্দুর ও মতি ততোদিনে শৈশব পার হয়ে কৈশোরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেতাদের সৌন্দর্য ও শিশুসুলভ মধুর আচরণের সুখ্যাতি সারা দেশে জনপ্রিয় ছিলতাই পূজার নির্দিষ্ট দিনে দেশের হাজার হাজার জনগণ সিন্দুর ও মতির পূজা দেখতে পুকুর পাড়ে এসে ভীড় করলযথাসময়ে পুকুরের তলদেশে আল্পনা এঁকে নৈবেদ্য নিবেদন করে পূজা আরম্ভ হলএক সময়ে তুমুল জয়ধ্বনির মাধ্যমে পূজানুষ্ঠান শেষও হলকিন্তু এক ফোঁটা জলও পুকুরে দেখা গেল নাসবাই বিমূঢ় হয়ে গেলএই সময় জমিদারের মনে পড়ে যায় তিনি তুলসী পাতা নিয়ে আসেননিসিন্দুর ও মতিকে পুকুরের শুকনো তলদেশে রেখে ছুটলেন রাজপ্রাসাদেএমন সময় বিকট শব্দ করে পুকুরের তলদেশ ভেদ করে তীব্রবেগে অজস্র জলরাশি বের হতে লাগলমুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ পুকুর জলে ভর্তি হয়ে গেলপূজার উপাচার ও সহযোগীগণ সবাই ভেসে উঠল কিন্তু ভেসে উঠলনা শুধু সিন্দুর ও মতিসকলকে অসীম দুঃখের মধ্যে ভাসিয়ে দুবোন ডুবে গেল পুকুরের অথৈ জলের মধ্যেপুকুরে জল আসায় দেশের প্রজাসাধারণের জলকষ্ট দূর হলেও জমিদার দম্পতি ডুবে গেলেন গভীর দুঃখেএ সময় দৈববাণীর মাধ্যমে জমিদার জানলেন -তাঁর দুকন্যার মুত্যু হয়নিপুকুরের তলদেশে দেবত্ব প্রাপ্ত হয়ে চির অমরত্ব লাভ করেছে জমিদার দম্পতি ও প্রজাসাধারণ এই দেবকথায় তৃপ্ত হলেন

এর এক বৎসর পর চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে মেনকা দেবী এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেনরাজ্যময় যেন শান্তি ফিরে এলজমিদার নবজাত পুত্রের নাম রাখেন ব্রহ্মদেবব্রহ্মদেবের বয়স যখন সাত বৎসর তখন জমিদার আবার এক নিদারুণ পরীক্ষার সম্মুখীন হনতিনি দৈব আদেশ পেলেন চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের বুধাষ্টমীতে চিলমারীর সন্নিকটে ব্রহ্মপুত্র নদের ত্রি-ধারায়(ত্রিবেণীতে) ব্রহ্মদেবকে পূণ্য স্নান করতে হবে মেনকা দেবীসহ দেশের জনগণ এক অনির্দেশ উৎকণ্ঠায় আতঙ্কিত হলেনসত্যনিষ্ঠ জমিদার নির্ধারিত দিনের এক দিন আগে হাতীর পিঠে চড়ে রওনা হলেন চিলমারীর দিকেমহাষ্টমীর ব্রাহ্মমুহূর্তে তিন নদীর সঙ্গমে জমিদার পুত্রকে নিয়ে নামেনপ্রথমে জমিদার নিজে স্নান করেন, তারপর পুত্রপুত্র ব্রহ্মদেব নম: বিষ্ণু: মন্ত্র পাঠ করে নদীতে ডুব দেয়আর সে ভেসে ওঠেনিশূন্যহাতে জমিদার নিজরাজ্যে ফিরে এলে এক বেদনা বিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়রাজ্যময় বিষাদের কালোছায়া নেমে আসেসেই রাতেই জমিদার স্বপ্নে দেখেন তাঁর সন্তানদের পবিত্র জীবন উৎসর্গের স্থান দুটি সর্বযুগের সর্বমানবের মঙ্গলের জন্য নিবেদিত হবেসেই থেকে চৈত্রমাসের অষ্টমী তিথিতে চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র নদের ত্রিবেণীতে এবং নবমী তিথিতে সিন্দুরমতিতে স্নানোৎসব পালন করা হয়সিন্দুর ও মতি নামক কন্যাদ্বয়ের স্মৃতির সাথে জড়িত এলাকাটির নাম রাখা হয় সিন্দুরমতি

এই স্থানটি খুবই প্রসিদ্ধপ্রতিবছর চৈত্র মাসের রাম নবমীর দিনে সিন্দুরমতিতে তীর্থোৎসব হয়ে থাকেএই উপলক্ষে পুকুরের চারপাশ ঘিরে এক বিরাট লোকজ মেলার আয়োজন হয়দেশ-বিদেশ থেকে পূণ্যার্থীরা এসে প্রতিবছর সিন্দুরমতি পুকুরে অবগাহন করেনগ্রামীন জীবনের অন্যতম অংশ এই মেলার প্রধান আকর্ষণ এলাকার কারু ও চারুশিল্পীদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যমাটি, বাঁশ, বেত, কাঠ ও শোলার তৈরি বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিসপত্রের সমারোহ এই মেলার গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেকালের পরিবর্তনে এইসব কুটির শিল্পজাত দ্রব্যের ব্যবহার কম হলেও মেলার আকর্ষণ এতে মোটেও কমেনি

১৯৭৫ সালে পুকুরটি সরকারী তত্ত্বাবধানে আংশিকভাবে পুনঃখনন করা হয়সেসময় প্রচুর পরিমাণে প্রাগৈতিহাসিক শ্রমঅস্ত্র পাওয়া গিয়েছিলএ ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার পাথরের মূর্তি, নৈবেদ্যরূপে দেয়া অনেক সোনা-রূপা ও তামার মুদ্রা পাওয়া গিয়েছিলএর সবই ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছেএলাকার সংস্কৃতি সচেতন জনগণ মনে করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে এখানে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে খননকার্য চালালে আমাদের অতীত ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায় উন্মোচিত হবে; বাড়বে এলাকার পর্যটন গুরুত্বআবহমানকালের বাঙালির তৃষ্ণা মেটানো এই পুকুরের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব তাই খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই

তথ্যসূত্র

রহস্যময় সিন্দুরমতির ইতিবৃত্ত - শ্রী ইন্দ্র কমল রায় দেবসিংহ

কোন মন্তব্য নেই »

কোন মন্তব্য নেই এখনও

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

মন্তব্য দিন

Blog at WordPress.com.